দিয়েগো মারাদোনা: ফুটবলের প্রচলিত জ্যামিতিকে অস্বীকার করা এক প্রতিভার নাম

জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য | একটি টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের মূল্যায়ন করতে গেলে গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির হিসাব যথেষ্ট নয়। কারণ তাঁরা শুধু ম্যাচ জেতেননি, ফুটবল খেলার প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছেন। দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা ছিলেন সেই বিরল শ্রেণির একজন।

মারাদোনাকে বোঝার জন্য প্রথমেই একটি বিষয় উপলব্ধি করা জরুরি। তিনি কেবল অসাধারণ ড্রিবলার ছিলেন না, কেবল দুর্দান্ত পাসারও ছিলেন না। তাঁর প্রকৃত বিশেষত্ব ছিল বল পায়ে রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করা এবং সেই বিশৃঙ্খলাকে আক্রমণের সুযোগে রূপান্তরিত করা।

আজকের ফুটবলে আমরা যাকে বলি progressive ball carrying, defensive line manipulation, press resistance কিংবা chance creation through central overload—মারাদোনা এই ধারণাগুলির অনেকগুলিই বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন এমন এক যুগে, যখন ফুটবল বিশ্লেষণের ভাষা এতটা বিকশিত হয়নি।

১. মারাদোনার ড্রিবলিং: গতি নয়, ভারসাম্য ও প্রতিপক্ষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার শিল্প

মারাদোনার ড্রিবলিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর শরীরের ভারকেন্দ্র।

মাত্র প্রায় ১.৬৫ মিটার উচ্চতার এই ফুটবলার বল নিয়ে দৌড়ানোর সময় হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে শরীরকে এমনভাবে রাখতেন, যাতে আকস্মিক দিক পরিবর্তনের সময়ও ভারসাম্য হারাতেন না।

কিন্তু শুধু নিচু ভারকেন্দ্র দিয়ে তাঁর ড্রিবলিং ব্যাখ্যা করা যায় না।

তাঁর আসল দক্ষতা ছিল প্রতিপক্ষের শরীরের অবস্থান পড়তে পারা।

একজন ডিফেন্ডার যখন মারাদোনার সামনে দাঁড়াতেন, মারাদোনা প্রথমেই তাঁকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতেন না। বরং ছোট ছোট স্পর্শে বল এগিয়ে নিয়ে ডিফেন্ডারকে একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়ে আসতে প্রলুব্ধ করতেন।

ডিফেন্ডার নিজের শরীরের ওজন একদিকে সরিয়ে ফেলামাত্র মারাদোনা বিপরীত দিকে বেরিয়ে যেতেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি অনেক সময় ডিফেন্ডারের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতেন না; বরং ডিফেন্ডারকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতেন, যেখান থেকে তাঁর পক্ষে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

এটিই ছিল তাঁর ড্রিবলিংয়ের প্রকৃত বিজ্ঞান।

আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মারাদোনা বলকে শরীর থেকে খুব বেশি দূরে যেতে দিতেন না। ফলে প্রতিপক্ষ যখন মনে করত বলটি কেড়ে নেওয়া সম্ভব, ঠিক সেই মুহূর্তে আর একটি ছোট স্পর্শে তিনি বল সরিয়ে ফেলতেন।

এই close control এবং deceptive acceleration-এর সমন্বয় তাঁকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছিল।

২. বল পায়ে নিয়ে এগোনো: মারাদোনা কীভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ভেঙে দিতেন

মারাদোনার খেলার একটি অসাধারণ দিক ছিল তাঁর বল বহন করার ক্ষমতা।

সাধারণভাবে একজন মাঝমাঠের খেলোয়াড় পাস দিয়ে বলকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পাঠান। মারাদোনা অনেক সময় নিজেই বল নিয়ে সেই দূরত্ব অতিক্রম করতেন।

এর ফলে প্রতিপক্ষের সামনে একটি জটিল সমস্যা তৈরি হত।

ধরা যাক, মারাদোনা মাঝমাঠে বল পেলেন। একজন ডিফেন্ডার তাঁকে আটকাতে নিজের অবস্থান ছেড়ে এগিয়ে এলেন।

মারাদোনা তাঁকে অতিক্রম করলেন।

এবার দ্বিতীয় ডিফেন্ডারকে এগিয়ে আসতে হল। ফলে রক্ষণভাগের অন্য কোথাও ফাঁকা জায়গা তৈরি হল।

মারাদোনা চাইলে সেই জায়গায় পাস দিতে পারতেন, আবার নিজেই এগিয়ে যেতে পারতেন।

অর্থাৎ তাঁর ড্রিবলিং শুধু একজন প্রতিপক্ষকে হারানোর ঘটনা ছিল না। প্রতিটি সফল ড্রিবল প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করত।

এখানেই মারাদোনা সাধারণ ড্রিবলার থেকে একজন অসাধারণ আক্রমণ-সংগঠকে পরিণত হয়েছিলেন।

৩. ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ: একজন ফুটবলার কীভাবে গোটা দলের আক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠলেন

১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা দলকে বিশ্লেষণ করলে মারাদোনার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়।

কার্লোস বিলার্দোর দলটি ছিল অত্যন্ত সংগঠিত, রক্ষণে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে বাস্তববাদী।

দলের কাঠামোয় তিন সেন্টার-ব্যাকের ব্যবহার, মাঝমাঠের পরিশ্রম এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে দ্রুত ওঠার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

কিন্তু আক্রমণের সৃজনশীল স্বাধীনতা অনেকাংশেই কেন্দ্রীভূত ছিল মারাদোনার মধ্যে।

তিনি প্রচলিত অর্থে শুধু একজন নম্বর দশ ছিলেন না।

কখনও মাঝমাঠে নেমে বল সংগ্রহ করতেন, কখনও দুই লাইনের মাঝখানে অবস্থান নিতেন, আবার কখনও সরাসরি প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের দিকে এগিয়ে যেতেন।

তাঁর এই চলাচল প্রতিপক্ষের মার্কিং ব্যবস্থাকে সমস্যায় ফেলত।

কারণ একজন ডিফেন্ডার তাঁকে অনুসরণ করলে নিজের নির্ধারিত অঞ্চল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হত। আর অনুসরণ না করলে মারাদোনা বল গ্রহণ করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেন।

বিলার্দো মারাদোনাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতার চারপাশে ছিল সুপরিকল্পিত দলগত কাঠামো।

ভালদানোর দৌড়, বুরুচাগার গতিশীলতা, জিউস্তি ও এনরিকের পরিশ্রম—সব মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে মারাদোনার ব্যক্তিগত প্রতিভা সর্বোচ্চ কার্যকারিতা পেয়েছিল।

এই বিশ্বকাপে মারাদোনা ৫টি গোল করেন এবং প্রচলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী আরও ৫টি গোলে সরাসরি সহায়তা করেন।

তবে তাঁর অবদান শুধু এই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আর্জেন্টিনার আক্রমণের গতি, দিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।

৪. ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গোল: ফুটবলের এক অনন্য টেকনিক্যাল প্রদর্শনী

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মারাদোনার দ্বিতীয় গোলটিকে সাধারণত সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোল বলা হয়।

কিন্তু এই গোলের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু পাঁচজন প্রতিপক্ষকে অতিক্রম করার মধ্যে নেই।

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বল পাওয়ার পর মারাদোনা দ্রুত নিজের শরীর ঘুরিয়ে সামনের দিকে এগোনোর পথ তৈরি করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি সরলরেখায় দৌড়াননি। তাঁর দৌড়ের গতিপথ বারবার সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের ফলে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা নিজেদের অবস্থান স্থির করতে পারেননি।

তৃতীয়ত, তিনি বলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন এমন গতিতে, যেখানে সাধারণত খেলোয়াড়দের স্পর্শ কিছুটা বড় হয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সামনে পৌঁছেও তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাননি।

এই গোলটি আসলে চারটি দক্ষতার এক অসাধারণ সমন্বয়—

  • শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা
  • দ্রুতগতিতে বল নিয়ন্ত্রণ
  • প্রতিপক্ষের অবস্থান বুঝে দিক পরিবর্তন
  • চূড়ান্ত মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ

অর্থাৎ গোলটি যতটা শারীরিক দক্ষতার, ততটাই ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন।

৫. মারাদোনার পাসিং: ড্রিবলিংয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া এক অসাধারণ ক্ষমতা

মারাদোনার ড্রিবলিং নিয়ে এত আলোচনা হয় যে তাঁর পাসিংয়ের অসাধারণ মান অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

অথচ তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের সৃজনশীল পাসার।

বিশেষত তাঁর through ball দেওয়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

তিনি শুধু সতীর্থ কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন তা দেখতেন না, বরং সতীর্থ পরবর্তী মুহূর্তে কোথায় পৌঁছাতে পারেন, সেটিও অনুমান করতেন।

এখানে তাঁর ড্রিবলিং ও পাসিংয়ের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক ছিল।

মারাদোনা বল নিয়ে এগোলে একাধিক ডিফেন্ডার তাঁর দিকে আকৃষ্ট হতেন। ফলে অন্য আক্রমণকারীদের জন্য জায়গা তৈরি হত।

ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি পাস ছাড়তেন।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে বুরুচাগার জয়সূচক গোলের আগে মারাদোনার পাস এই দক্ষতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সেই মুহূর্তে মারাদোনা নিজে গোল করার চেষ্টা না করে সতীর্থের দৌড়ের পথটি চিনতে পেরেছিলেন।

মারাদোনার বিশেষত্ব ছিল, তিনি নিজে বিপজ্জনক হওয়ার পাশাপাশি সতীর্থদেরও বিপজ্জনক করে তুলতেন।

৬. নাপোলির মারাদোনা: ব্যক্তিগত প্রতিভা থেকে একটি দলের পরিচয় নির্মাণ

মারাদোনার ফুটবলীয় মহত্ত্ব বোঝার জন্য নাপোলির অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮৪ সালে তিনি যখন নাপোলিতে যোগ দেন, তখন ইতালির ফুটবল ছিল বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশগুলির একটি।

সেই সময়ের সেরি আ-তে রক্ষণাত্মক সংগঠন, ব্যক্তিগত মার্কিং, শারীরিক সংঘর্ষ এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

এমন পরিবেশে মারাদোনা শুধু নিজের প্রতিভা প্রদর্শন করেননি; নাপোলির আক্রমণব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন।

তিনি মাঝমাঠে নেমে বল গ্রহণ করতেন, প্রতিপক্ষের চাপ অতিক্রম করতেন এবং আক্রমণের শেষ পর্যায়ে সতীর্থদের যুক্ত করতেন।

পরবর্তীকালে কারেকা ও জিওর্দানোর মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া নাপোলির আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করে।

নাপোলির সাফল্য অবশ্যই একটি দলগত অর্জন। কিন্তু সেই দলের সৃজনশীল পরিচয় নির্মাণে মারাদোনার প্রভাব ছিল অসামান্য।

১৯৮৬–৮৭ এবং ১৯৮৯–৯০ মরশুমে নাপোলির সেরি আ জয়, ১৯৮৭ সালের কোপা ইতালিয়া এবং ১৯৮৯ সালের উয়েফা কাপ—এই সাফল্যগুলির কেন্দ্রে ছিল তাঁর ফুটবলীয় প্রভাব।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার।

অনেক মহান ফুটবলার শক্তিশালী দলে যোগ দিয়ে সেই দলকে আরও শক্তিশালী করেছেন।

মারাদোনা এমন একটি ক্লাবকে ইতালীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিলেন, যার আগে কোনও সেরি আ শিরোপা ছিল না।

৭. মারাদোনা কি আধুনিক ফুটবলের প্রেসিংয়ের বিরুদ্ধে সফল হতেন?

এই প্রশ্নটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে বল গ্রহণের মুহূর্তেই চাপে ফেলার প্রবণতা অনেক বেশি সংগঠিত।

কিন্তু মারাদোনার কয়েকটি মৌলিক দক্ষতা আধুনিক ফুটবলেও অত্যন্ত কার্যকর হওয়ার কথা।

প্রথমত, তিনি প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যে শরীর ব্যবহার করে বল আড়াল করতে পারতেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি প্রথম স্পর্শেই বলকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারতেন, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, একাধিক ডিফেন্ডারের মাঝখানেও তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ ও দিক পরিবর্তনের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

এই বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক press-resistant midfielder কিংবা advanced playmaker-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

অবশ্যই আধুনিক ফুটবলের গতি, দলগত প্রেসিং এবং শারীরিক প্রস্তুতির সঙ্গে তাঁকে মানিয়ে নিতে হত।

কিন্তু তাঁর মূল শক্তি ছিল দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সেই ক্ষমতার গুরুত্ব কোনও যুগেই কমে না।

৮. মারাদোনা ও মেসি: দুই যুগের দুই আর্জেন্টাইন প্রতিভার ফুটবলীয় সম্পর্ক

মারাদোনার আলোচনা করতে গেলে লিওনেল মেসির প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই আসে।

দুজনের মধ্যে কিছু বিস্ময়কর সাদৃশ্য রয়েছে।

দুজনেই বাঁ-পায়ের ফুটবলার। দুজনেরই নিচু ভারকেন্দ্র, অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ এবং সংকীর্ণ জায়গায় ড্রিবলিং করার ক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু তাঁদের খেলার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে।

মারাদোনার ড্রিবলিংয়ে শরীরের ব্যবহার, আকস্মিক বাঁক এবং প্রতিপক্ষকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

মেসির ড্রিবলিং তুলনামূলকভাবে আরও ক্ষুদ্র স্পর্শ, নিখুঁত গতি পরিবর্তন এবং ধারাবাহিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপর নির্ভরশীল।

মারাদোনা অনেক সময় মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে আক্রমণের সম্পূর্ণ গতিপথ নিজেই নির্মাণ করতেন।

মেসি, বিশেষত তাঁর পরিণত পর্যায়ে, ড্রিবলিংয়ের পাশাপাশি পাসিং, গোল করার দক্ষতা এবং মাঠের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনা করেছেন।

আরও একটি পার্থক্য হল তাঁদের ফুটবলীয় পরিবেশ।

মারাদোনাকে খেলতে হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন কঠোর ট্যাকল, ব্যক্তিগত মার্কিং এবং অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষামূলক রেফারিং তাঁর মতো খেলোয়াড়দের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

অন্যদিকে মেসিকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অত্যন্ত সংগঠিত দলগত প্রেসিং, উন্নত রক্ষণাত্মক কাঠামো এবং আধুনিক ফুটবলের উচ্চগতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি।

তাই দুজনকে বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায় শুধু শ্রেষ্ঠত্বের তুলনা নয়, বরং তাঁদের নিজ নিজ যুগে ফুটবলের সমস্যাগুলির সমাধান কীভাবে করেছেন, তা বিশ্লেষণ করা।

৯. মারাদোনার প্রকৃত মহত্ত্ব: প্রতিভা, প্রভাব এবং ফুটবলীয় স্বাধীনতা

মারাদোনার ক্যারিয়ার নিখুঁত ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক, শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন উত্থান-পতন তাঁর ইতিহাসেরই অংশ।

কিন্তু ফুটবলীয় বিচারে তাঁর অসাধারণত্বকে অস্বীকার করা যায় না।

তিনি এমন একজন খেলোয়াড় ছিলেন, যাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের গোটা রক্ষণপরিকল্পনাকে বদলে দিতে পারত।

একজন ডিফেন্ডার তাঁকে আটকাতে যথেষ্ট ছিলেন না। কখনও দুজন, কখনও তিনজনকে তাঁর দিকে মনোযোগ দিতে হত।

আর এই অতিরিক্ত মনোযোগই সতীর্থদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করত।

ফুটবলের ভাষায় একে বলা যেতে পারে gravitational influence—একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি ও বলের উপর দক্ষতা প্রতিপক্ষকে তাঁর দিকে টেনে এনে মাঠের অন্য অঞ্চলে সুযোগ তৈরি করে।

মারাদোনা ছিলেন এই ক্ষমতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক উদাহরণ।

শেষ কথা: মারাদোনা ছিলেন ফুটবলের এক অসম্ভব সুন্দর ব্যতিক্রম

ফুটবল ক্রমশ সংগঠিত হয়েছে। কৌশল উন্নত হয়েছে। খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা, তথ্যবিশ্লেষণ এবং দলগত পরিকল্পনা আজ অনেক বেশি পরিশীলিত।

কিন্তু ফুটবলের একটি সৌন্দর্য চিরকাল অপরিবর্তিত থাকবে।

সেটি হল—একজন খেলোয়াড় বল পায়ে নেওয়ার পর এমন কিছু করে ফেলতে পারেন, যা প্রতিপক্ষের সমস্ত পরিকল্পনাকে মুহূর্তের মধ্যে অকার্যকর করে দেয়।

মারাদোনা ছিলেন সেই অনিশ্চয়তার সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন।

তাঁর ফুটবলে ছিল রাস্তার ফুটবলের স্বতঃস্ফূর্ততা, একজন শিল্পীর কল্পনা, একজন আক্রমণ-সংগঠকের বুদ্ধিমত্তা এবং একজন প্রতিযোগীর অদম্য জয়ের ইচ্ছা।

তাঁকে শুধু ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে বিচার করলে তাঁর প্রতিভার সম্পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না। আবার নাপোলির দুটি লিগ শিরোপা দিয়েও তাঁর প্রভাবের গভীরতা বোঝানো যায় না।

কারণ মারাদোনার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কোনও নির্দিষ্ট ট্রফি নয়।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ফুটবল যতই দলগত খেলা হোক না কেন, কখনও কখনও একজন মানুষের কল্পনাশক্তি গোটা ম্যাচের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা তাই শুধু একজন মহান ফুটবলার নন।

তিনি ফুটবলের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার এক চিরস্থায়ী প্রতীক।

শুভ জন্মদিন, দিয়েগো।

ফুটবলের ইতিহাসে তোমার স্থান শুধু পরিসংখ্যানে নয়, সেই অসংখ্য মুহূর্তে—যখন বল তোমার পায়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভবও সম্ভব বলে মনে হত।

🇦🇷 Diego Armando Maradona (30 October 1960 – 25 November 2020)

Leave a Reply